২৬৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিন শেষ করল স্বাগতিকেরা

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনটা মিশ্র অভিজ্ঞতায় কাটল বাংলাদেশের। একদিকে হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৩৫৬ রানে থেমেছে ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস। অন্যদিকে ব্যাটিংয়ে শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে আবারও চাপে পড়েছে স্বাগতিকেরা। এর মধ্যে ফিল্ডিং করতে গিয়ে চোট পেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে ওপেনার শাদমান ইসলামকে।

দ্বিতীয় দিনের সকালে আগের দিনের ২৩৫ রানের সঙ্গে আরও ১২১ রান যোগ করে ১০৬.৪ ওভারে ৩৫৬ রানে অলআউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দলের হয়ে ২১২ বলে ১৩৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছেন আমির জ্যাঙ্গু। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৩টি চার ও দুটি ছক্কা। এ ছাড়া কেভিন উইকহাম ১৪৫ বলে ৬১ এবং জাস্টিন গ্রিভস ১১২ বলে ৫১ রান করেন।

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে দিনের নায়ক হাসান মাহমুদ। ২৪ ওভার বল করে ৯০ রান দিয়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। প্রথম দিনের দুটি উইকেটের পর দ্বিতীয় দিনে আরও চারটি উইকেট নিয়ে ক্যারিবীয়দের ইনিংস গুটিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন এই পেসার। এটা তার ক্যারিয়ার সেরা দ্বিতীয় ইনিংস।

দ্বিতীয় দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিকার আমির জ্যাঙ্গু। ২১২ বলে ১৩৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা এই সেঞ্চুরিয়ানকে বোল্ড করেন হাসান। জ্যাঙ্গুর ইনিংসে ছিল ১৩টি চার ও দুটি ছক্কা। তাঁর বিদায়ে ২৬৪ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এরপর একই স্কোরে ষষ্ঠ উইকেটের পতন ঘটান হাসান। অধিনায়ক রস্টন চেজ মাত্র ১ বল খেলে কোনো রান না করেই ফিরেছেন। লিটন দাসের হাতে ক্যাচ তুলে দেন তিনি।

হাসানের পরের শিকার জশুয়া বিশপ। ২৫ বলে ২৩ রান করা এই ব্যাটসম্যানকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন লিটন দাস। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ২৯৭ রানে ধুঁকছিল।

শামার জোসেফকে বোল্ড করে নিজের ষষ্ঠ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। ১৮ বলে ১৬ রান করেছিলেন জোসেফ। ৩২৩ রানে নিজের শেষ পেরেক ঠুকেন হাসান।

শেষ উইকেটে জোমেল ওয়ারিকান ও জেডেন সিলসের ৩৩ রানের জুটি ভাঙতে বাংলাদেশের অপেক্ষা করতে হয়েছে ৬৭ বল। শেষ পর্যন্ত মেহেদী হাসান মিরাজের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন সিলস। ৩৮ বলে ১৫ রান করেন তিনি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নিয়েও রক্ষা পাননি এই ব্যাটসম্যান। অন্য প্রান্তে ৪৮ বলে ২৭ রান করে অপরাজিত থাকেন ওয়ারিকান। সিলসের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ১০৬.৪ ওভারে ৩৫৬ রানে গুটিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস।

হাসানের ছয় উইকেটের পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ ২১ ওভারে ৯০ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩১.৪ ওভারে ৮২ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। তাইজুল ইসলাম ১৯ ওভারে ৫৪ এবং নাঈম হাসান ১১ ওভারে ৩৭ রান দিলেও কোনো উইকেট পাননি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ব্যাট হাতে ভালো জবাব দেওয়ার। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্বাগতিকেরা। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ৪০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮৮ রান। প্রথম ইনিংসে এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে দল।

বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা লাগে। ৪.২ ওভারে ব্যক্তিগত ৫ রান করে বিদায় নেন নাইটওয়াচম্যান নাঈম হাসান। ৬ বলের ইনিংসে একটি চার মারেন তিনি। জেডেন সিলসের বলে ব্র্যান্ডন কিংয়ের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই ব্যাটসম্যান।

এরপর ৮.৬ ওভারে ৩৩ বলে ১৬ রান করে সাজঘরে ফেরেন তানজিদ হাসান তামিম। তাঁর ইনিংসে ছিল দুটি চার। জাস্টিন গ্রিভসের বলে কেভিন উইকহামের হাতে ক্যাচ দেন তিনি।

তৃতীয় উইকেটে ফিরে যান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ৬৫ বল মোকাবিলা করে ১৮ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল একটি চার ও একটি ছক্কা। শামার জোসেফের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। ২২.৪ ওভারে দলীয় ৫১ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

এরপর আর কোনো উইকেট পড়তে দেননি তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দিনের বাকি সময় পার করে বাংলাদেশ। ৪০ ওভার শেষে হৃদয় ৮০ বলে ২৯ রান করে অপরাজিত রয়েছেন। তাঁর ইনিংসে রয়েছে দুটি চার। অন্যদিকে মুশফিকুর রহিম ৫৬ বলে ১৯ রান নিয়ে অপরাজিত আছেন। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে দুটি চার।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের চিত্র বলছে, শুরু থেকেই রান তুলতে বেশ সতর্ক ছিলেন ব্যাটসম্যানরা। বিশেষ করে শান্ত ৬৫ বল খেলেও ১৮ রানের বেশি করতে পারেননি। তিনটি উইকেট হারানোর পর হৃদয় ও মুশফিকের প্রতিরোধে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে স্বাগতিক শিবিরে।

তবে দিনের সবচেয়ে উদ্বেগের খবর শাদমান ইসলামের চোট। ফিল্ডিংয়ের সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় এই ওপেনারকে। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চোটের কারণে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাটিংয়ে নামা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে ২৬৮ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ। হাতে রয়েছে সাত উইকেট। হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি হলেও ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।

সিলেট টেস্টে লড়াইয়ে ফিরতে হলে তাওহিদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিমকে বড় জুটি গড়তে হবে। একই সঙ্গে পরের ব্যাটসম্যানদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। দ্বিতীয় দিনের শেষে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন প্রথম ইনিংসের ঘাটতি কমানো।

এরআগে, প্রথম দিন টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে শুরুটা ভালো হয়নি সফরকারীদের। মাত্র ২৭ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। ব্র্যান্ডন কিং ১৮ বলে ৯, কাভেম হজ ১০ বলে ১ এবং জশুয়া দা সিলভা ১৭ বলে ১২ রান করে আউট হন।

এরপর চতুর্থ উইকেটে আমির জ্যাঙ্গু ও কেভিন উইকহাম ১৩১ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেন। প্রথম দিনের খেলা শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ২৩৫ রান। জ্যাঙ্গু ১১১ রানে অপরাজিত থেকে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। উইকহাম তখন ৬১ রানে ব্যাট করছিলেন।

প্রথম দিনের শেষ দিকে বাংলাদেশের স্পিনাররা প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। তাসকিন ও হাসানের পেস আক্রমণে শুরুতে তিন উইকেট পড়লেও পরবর্তী সময়ে জ্যাঙ্গু ও উইকহামের জুটি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের দিকে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় দিনের সকালে অবশ্য হাসান মাহমুদের ছয় উইকেটের সুবাদে ৩৫৬ রানেই থামে ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস।