ক্বীনব্রিজ আড়াল করে ‘I ❤️ Sylhet’ সাইনবোর্ড, নান্দনিকতা ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন

সিলেট নগরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্বীনব্রিজের পাশেই স্থাপন করা হয়েছে ‘I ❤️ Sylhet’ সাইনবোর্ড। শহরের ব্র্যান্ডিং ও পর্যটন আকর্ষণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও, এর নকশা, আকার, অবস্থান নির্বাচন এবং সাইনবোর্ডে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, সুরমা নদীর তীরবর্তী ওয়াকওয়ের পাশে বড় আকৃতির কালো রঙের একটি কাঠামোতে ‘I ❤️ SYLHET’ লেখা স্থাপন করা হয়েছে। সাইনবোর্ডটির ঠিক পেছনেই রয়েছে সিলেটের ঐতিহাসিক ক্বীনব্রিজ। তবে অনেকের অভিযোগ, স্থাপনাটির উচ্চতা ও অবস্থানের কারণে ক্বীনব্রিজের নান্দনিক সৌন্দর্য অনেকটাই আড়াল হয়ে গেছে।

ফেসবুকে এ নিয়ে অসংখ্য মন্তব্য করেছেন নগরবাসী। তাঁদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সিলেটকে তুলে ধরতে গিয়ে কেন শহরের সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকেই আড়াল করা হলো? তাঁদের মতে, ক্বীনব্রিজ নিজেই সিলেটের অন্যতম পরিচয়চিহ্ন। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই আরও পরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দনভাবে সাইনবোর্ডটি নির্মাণ করা যেত।

সমালোচকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন শহরের আদলে শুধু ‘I ❤️ City’ ধরনের একটি সাইনবোর্ড বসিয়ে শহরের স্বকীয় পরিচয় তুলে ধরা যায় না। সিলেটের চা-বাগান, হাওর, জাফলং, রাতারগুল, সুফি ঐতিহ্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো প্রতিফলন এই নকশায় নেই। ফলে এটি একটি মৌলিক নগর পরিচয়ের পরিবর্তে অনুকরণধর্মী স্থাপনা বলেই মনে হচ্ছে।

আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক নাগরিক। সাইনবোর্ডের এক পাশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর লোগো যুক্ত করা হয়েছে। জনসাধারণের জন্য নির্মিত এবং শহরের পরিচয় বহনকারী একটি স্থাপনায় করপোরেট ব্র্যান্ডিং কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক চলছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো শহরের পরিচয়বাহী স্থাপনা শুধু ছবি তোলার স্থান নয়; এটি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্যচিন্তা ও নান্দনিকতার প্রতীক। তাই এমন স্থাপনা নির্মাণের আগে স্থান নির্বাচন, নকশা, ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্ট এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নাগরিকদের একটি অংশের ভাষ্য, উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট। তাঁদের মতে, ক্বীনব্রিজের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে নদীতীরের অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে কিংবা অপেক্ষাকৃত ছোট ও সৃজনশীল নকশায় এই সাইনবোর্ড নির্মাণ করা হলে তা আরও আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য হতো।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, জনসাধারণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পে রুচিবোধ, নগর পরিকল্পনা ও স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতিফলন নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একটি শহরের সৌন্দর্য গড়ে ওঠে সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে কবি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ঐতিহাসিক ক্বীনব্রিজ আড়াল করে গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপন। সিলেট সিটি করপোরেশনের নজরে পড়বে কী?

মো: মোশাহিদ আলী লিখেছেন, ইকান ইনো না দিয়া অউ কুনাবায় দিলায় না খেনে বা সোনা হক্কল আই লাভ হুনিয়া আর মাথায় খাম করছে না নি। ফুরান পুল ঘুরিয়া গ্রামীণফোনে I❤️Sylhet দিয়া মন ফাইছে।

পিংকু দাস লিখেছেন, ঐতিহাসিক ক্বীনব্রিজ আড়াল করে গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপন।সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে কী অনুমতি নেয়নি গ্রামীণ ফোন? যদি নিয়ে তাকে তা হলে তারা কী ভাবে এই অনুমতি দিলেন?

এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নগরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও নান্দনিকতা অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়নকাজের চেষ্টা করা হচ্ছে। নগরবাসীর রুচি ও প্রত্যাশাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিনব্রিজের সৌন্দর্য যেন আড়াল না হয়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে সাইনেজের স্থানও পরিবর্তন করা হবে।’

তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, সমালোচনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সাইনবোর্ডটির নকশা ও অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, যাতে শহরের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আধুনিক নগর নান্দনিকতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়।