বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দলের জোয়ার: সংখ্যার ভিড়ে মানের প্রশ্ন

শাহাবুদ্দিন শুভ :: বাংলাদেশ—সব সম্ভবের দেশ। এখানে এমন কিছু নেই যা ইচ্ছা করলেই করা যায় না। রাজনৈতিক শক্তি, অর্থ এবং প্রভাব থাকলে সব কিছু সম্ভব। আর এসবের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে রাজনীতি। বিগত ৮মাসে দেশে নতুন রাজনৈতিক দলের যে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। গত বছর ১১টি এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই আরও ১২টি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় তিনটি করে নতুন দল বা সংগঠন গঠিত হয়েছে।

গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—এই পাঁচ মাসে ১১টি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দল জন্ম নেয় সেপ্টেম্বরে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি) আত্মপ্রকাশ করে। এরপর একে একে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক পার্টি, ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, সমতা পার্টি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি, সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তির ডাক ৭১, বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি এবং জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আরও ১২টি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। ৪ জানুয়ারি দেশ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে বছর শুরু হয়। এরপর ২৮ জানুয়ারি একই দিনে আমজনতার দল ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি গঠিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি আত্মপ্রকাশ করে। মার্চে জনতার বাংলাদেশ পার্টি এবং জনতার দল আত্মপ্রকাশ করে। এপ্রিল মাসে গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেয়। আজ শনিবার আরও একটি নতুন দলের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা রয়েছে।
এত বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক দলের জন্মের পেছনে আসলেই কী উদ্দেশ্য কাজ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একটি সাক্ষাৎকারে এমএলএম ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত রফিকুল আমীন তার হঠাৎ রাজনীতিতে নাম লেখানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার কারণে, যখন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালান, তখন অনেককে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও তিনি সে সুযোগ পাননি। রফিকুল আমীন বলেন, “যেদিন হাসিনা পালিয়ে গেলেন, পাঁচ তারিখ, ছয় তারিখ, সাত তারিখ, আট তারিখ, নয় তারিখ—এই কয়দিনে ঢাকা জেল প্রায় খালি হয়ে গেছে। মানুষকে দিন-রাত মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত লোকের জামিন কিভাবে হলো? বলে, না, জামিন হয়নি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি তখন জেল সুপারের কাছে দৌড়ে গেলাম। বললাম, আমি তো এতদিন ধরে বন্দি আছি, আমাকে ছাড়েন। তিনি বললেন, আপনি তো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। যদি অন্তত হরকাতুল জিহাদ কিংবা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যও হতেন, তবুও আপনাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তি দেওয়া যেত।”
এই অভিজ্ঞতা থেকেই রফিকুল আমীন উপলব্ধি করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া নিজেকে রক্ষার উপায় নেই। তাই তিনি রাজনৈতিক মঞ্চকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান, যেন ভবিষ্যতে যে প্রশাসক বা রাষ্ট্রশাসক থাকবেন, তার কাছে নিজের ‘জুলুমের কথা’ পৌঁছে দিতে পারেন।

এখানে লক্ষণীয় যে, অনেক নতুন রাজনৈতিক দল কেবল নাম সর্বস্ব। এর আগে বাংলাদেশে বা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে একসঙ্গে এত বেশি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে কিনা ? হয়তো বাংলাদেশই একটি অনন্য বিশ্ব রেকর্ড করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিপুল সংখ্যক দল গঠনের মাধ্যমে আদৌ গুণগত মান ও চিন্তাধারায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না?
একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি—মাত্র একটি দল থেকে বিভিন্ন কারণে বেরিয়ে এসে পাঁচ-ছয়টি নতুন দলের প্রধান বা শীর্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। তাদের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি । সত্যি বলতে, তাদের রাজনৈতিক দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আসলে কি তারা একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনা বা একটি পার্টির ‘থিঙ্ক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করার মতো উপযুক্ত অবস্থানে আছেন?

ডেসটিনির রফিকুল আমীনের মতো ব্যক্তিরা যদি শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দল গঠন করেন, তাহলে প্রশ্ন জাগে, তারা সাধারণ মানুষের জন্য কী করবেন? আর যদি অধিকাংশ নতুন দলের জন্মের পেছনে এ রকম ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাধারা থাকে, তাহলে এই দলগুলো দিয়ে দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র কিংবা জনগণের কতটুকু উপকার হবে—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রশ্ন।

তবুও আমি আশাবাদী। আমি মনে করি, ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তন হবে সংখ্যায় নয়, মানের দিক থেকে। সত্যিকারের নেতৃত্ব, জনমানুষের চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা নিয়ে একদিন গড়ে উঠবে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশকে আরও উন্নত এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে।

শাহাবুদ্দিন শুভ
ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট
ahmedshuvo@gmail.com