নির্বাচনে ড. রেজা কিবরিয়ার জয় ও বিএনপির কাছে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ড. রেজা কিবরিয়া’র নির্বাচনে জয় কেবল একটি ব্যক্তিগত বা দলীয় সাফল্য নয়; এটি বিরোধী রাজনীতির জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতি যে মেরুকরণ, অনাস্থা ও নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, সেখানে একজন নীতিনির্ভর ও অর্থনৈতিক চিন্তায় সমৃদ্ধ নেতার বিজয় নতুন আশার সঞ্চার করে। তাঁর এই সাফল্যকে অনেকেই দক্ষতা, শিক্ষাগত প্রস্তুতি ও সুশাসনমুখী ভাবনার প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

রেজা কিবরিয়ার ক্যারিয়ার তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘদিন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেন। উন্নয়ন অর্থনীতি, আর্থিক খাত সংস্কার, দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে তাঁর কাজ তাঁকে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নীতি-পরিকল্পনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল তাত্ত্বিক নয়, প্রয়োগিক জ্ঞানেও সমৃদ্ধ করেছে। এই পেশাগত পটভূমি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁর সক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর পিতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া ছিলেন একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ। সেই ঐতিহ্য রেজা কিবরিয়াকে রাজনৈতিকভাবে একটি নৈতিক অবস্থান দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে দায়িত্বও বাড়িয়েছে। পিতার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহিরে গিয়ে নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল উত্তরাধিকার বহনকারী নন; বরং নিজস্ব যোগ্যতা, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।

এখন প্রশ্ন হলো— এলাকার মানুষ তাঁকে দল-মতের বাহিরে গিয়ে বার বার সমর্থন করেছেন কিন্তু দল কী পারবে তাঁর যোগ্যতার প্রতিদান দিতে? বিএনপি তাঁকে কী দায়িত্ব দিচ্ছে বা দেওয়া উচিত? বিএনপি কি পারবে ‘রাইট পজিশন ফর রাইট ম্যান’ নীতি অনুসরণ করতে?

ড. রেজা কিবরিয়াকে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করলে প্রথমত, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও সংস্কার প্রস্তাব তৈরিতে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনা যেতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পরিবেশ—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি। রেজা কিবরিয়ার বিশ্বব্যাংকের অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন অর্থনীতির জ্ঞান এই ক্ষেত্রে দলের জন্য একটি বড় সম্পদ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ উন্নয়নে তাঁর দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বৈশ্বিক পরিসরে কাজ করার ফলে তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। বিএনপি যদি তাঁকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক নীতিনির্ধারণে সামনে আনে, তবে তা দলটির ভাবমূর্তি ও কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।

তৃতীয়ত, দলীয় আধুনিকায়ন ও গবেষণাভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একটি শক্তিশালী থিংক-ট্যাঙ্ক, তথ্যভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ এবং তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ—এসব ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব দলকে সময়োপযোগী রূপ দিতে পারে। তাঁর পেশাগত শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা দলীয় কাঠামোকে আরও পেশাদার করতে সহায়ক হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, রেজা কিবরিয়ার নির্বাচনী জয় কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ পেশাগত ও শিক্ষাগত প্রস্তুতির একটি স্বীকৃতি। এখন বিএনপির দায়িত্ব হলো তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর দায়িত্বের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দেওয়া। তা করতে পারলে এই জয় কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং দল ও দেশের জন্যও ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

কারণ, অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া বা ড. রেজা কিবরিয়ার মতো মানুষ প্রতি বছর বা প্রতি শতাব্দীতে জন্মেন না। তারা শত বছরে দুই এক জন জন্মেন। তাই দেশ ও সমাজের স্বার্থে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত।